BONGরামায়ণ
বালকাণ্ড · সর্গ ১

গোটা রামায়ণের ট্রেলার

অচিন্ত্যরূপ রায় · ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বালকাণ্ড · সর্গ ১ — গোটা রামায়ণের ট্রেলার

আজ থেকে শুরু।

তপঃস্বাধ্যায়নিরতং তপস্বী বাগ্বিদাং বরম্।
নারদং পরিপপ্রচ্ছ বাল্মীকির্মুনিপুঙ্গবম্॥

(তপস্যা আর বেদপাঠে মগ্ন, কথার জাদুকরদের সেরা, মুনিশ্রেষ্ঠ নারদকে তপস্বী বাল্মীকি জিজ্ঞেস করলেন…)

ভাই, একটা সিন ভাব। ঘন জঙ্গলের ভেতর এক ঋষির আশ্রম। নাম বাল্মীকি। সারাজীবন তপস্যা করেছেন, শাস্ত্র গুলে খেয়েছেন — কিন্তু মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন তাঁর ঘুরতেই থাকে। একদিন আশ্রমে এসে হাজির আরেক হেভিওয়েট — ঋষি নারদ। তিন লোকের, মানে পুরো ইউনিভার্সের, খবর যাঁর নখদর্পণে। বাল্মীকি ভাবলেন, তাঁর মনে যে প্রশ্ন আছে, তার জবাব জানার জন্য এর থেকে রিলায়েবল সোর্স আর হয় না। ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

বাল্মীকি সোজা জিজ্ঞেস করলেন, "একটা স্ট্রেট কোয়েশ্চেন আছে মহর্ষি। এই মুহূর্তে, এই গোটা দুনিয়ায়, এমন একটা লোক কি সত্যিই আছে — যে একসাথে গুণীও, আবার পাওয়ারফুলও, অথচ ঠিক-ভুলের সেন্সটাও পুরো ক্লিয়ার? যে সবসময় সত্যি বলে, কথা দিলে কথা রাখে? যে সব প্রাণীর ভালো চায়, শিক্ষিত, ট্যালেন্টেড, আবার দেখতেও জাস্ট দুর্দান্ত? যে নিজের রাগ পুরো কন্ট্রোলে রাখতে পারে, যে একটুও হিংসুটে নয় — কিন্তু যুদ্ধে যদি একবার রেগে যায় তখন দেবতারাও তাকে ভয় পায়? পুরো এই প্যাকেজটা একটাই লোকের মধ্যে — পসিবল আদৌ? থাকলে নামটা বলুন না, আমার জাস্ট জানতেই হবে।"

নারদ শুনে পুরো খুশ। বললেন, "শোনো। তুমি যা যা লিস্ট দিলে, এই কম্বিনেশন রিয়েল লাইফে পাওয়া হেভি টাফ। কিন্তু আছে। একটাই লোক আছে, যার মধ্যে তোমার সব কটা বক্স টিক করা। নাম — রাম। ইক্ষ্বাকু বংশের ছেলে।

"চওড়া কাঁধ, পেটানো হাত হাঁটু অবধি লম্বা, শঙ্খের মতো গলা, চওড়া বুক, হাতে বিশাল ধনুক। গায়ের রং ঘন শ্যাম, মেঘের মতো; চোখ দুটো বড় বড়। পুরো রয়্যাল লুক। আর ক্যারেক্টার? মনটা সাগরের মতো গভীর, হিমালয়ের মতো অটল। রেগে গেলে প্রলয়ের আগুন, কিন্তু ক্ষমা করার সময় গোটা পৃথিবীর মতো ধৈর্য। পাওয়ারে ডিটো বিষ্ণু, দেখতে শান্ত চাঁদের মতো। দানে কুবের, সত্যিতে স্বয়ং ধর্ম। শর্টে — ফুল প্যাকেজ।"

তারপর নারদ যা বললেন, সেটাই আসলে গোটা রামায়ণের ট্রেলার। পুরোটা শুনুন।

রামের বাবা, রাজা দশরথ, ঠিক করলেন ছেলেকে ক্রাউন প্রিন্স বানাবেন। প্রমোশন কনফার্মড, প্রিপারেশন শুরু। কিন্তু লাস্ট মোমেন্টে — টুইস্ট। সৎ মা কৈকেয়ী অনেক আগে পাওয়া দুটো বর হঠাৎ ক্যাশ করালেন: এক, রামের চোদ্দ বছর বনবাস; দুই, গদিতে বসবে ভরত। দশরথ নিজের কথার জালেই ফেঁসে গেলেন। কিন্তু প্রমিস তো প্রমিস। চোখের জলে নিজের প্রিয় ছেলেকে জঙ্গলে পাঠাতে বাধ্য হলেন।

আর রাম? একটুও সিন ক্রিয়েট না করে কুল মাথায় বেরিয়ে পড়লেন। সাথে দুজন — লয়াল ভাই লক্ষ্মণ, আর স্ত্রী সীতা। গঙ্গার ধারে শৃঙ্গবেরপুরে নিষাদরাজ গুহর সাথে দেখা; সেখানেই সারথিকে ফেরত পাঠিয়ে, একের পর এক নদী পেরিয়ে, ঋষি ভরদ্বাজের গাইডেন্সে তিনজন পৌঁছলেন চিত্রকূট পাহাড়ে। সেখানে নিজেদের হাতে কুঁড়ে বানিয়ে দিব্যি সংসার পেতে বসলেন।

এদিকে ছেলের শোকে দশরথ আর সামলাতে পারলেন না — স্বর্গে গেলেন। সবাই ভরতকে বলল, "তুমি রাজা হও।" কিন্তু ভরত পাত্তাই দিল না। উল্টে দাদাকে ফেরাতে জঙ্গলে ছুটে গেল। রাম বোঝালেন, ফিরে যা। নিজের এক জোড়া খড়ম গদির প্রতীক হিসেবে ভরতের হাতে দিলেন। ভরত সেই খড়ম মাথায় নিয়ে নন্দিগ্রামে বসে রাজ্য চালাতে লাগল — দাদা কবে ফিরবে, সেই অপেক্ষায়।

আর রাম? ঢুকে পড়লেন দণ্ডক জঙ্গলে। আসল অ্যাকশন এখান থেকেই। প্রথমে বিরাধ রাক্ষস — খতম। তারপর একে একে শরভঙ্গ, সুতীক্ষ্ণ, অগস্ত্য মুনির সাথে দেখা। অগস্ত্য দিলেন ইন্দ্রের ধনুক, একটা তলোয়ার, আর দুটো তূণ — যার তির কোনোদিন ফুরোয় না। আনলিমিটেড অ্যামো, আনলকড।

এর মধ্যেই জনস্থানে শূর্পণখা নামের এক রূপ-বদলানো রাক্ষসীর সাথে গন্ডগোল। লক্ষ্মণ তার নাক-কান কেটে দিলেন। সেই রিপোর্ট নিয়ে চড়াও হল খর, দূষণ, ত্রিশিরা — গোটা একটা আর্মি। রাম একা হাতে সাফ করলেন চোদ্দ হাজার রাক্ষস। ভাই, চোদ্দ হাজার। একা।

খবর গেল সোজা লঙ্কায় — রাবণের কাছে। ভাইবেরাদরের মৃত্যুর খবরে রাবণ রেগে আগুন। প্ল্যান বানাতে ডাকল মারীচ নামের এক রাক্ষসকে। মারীচ বারবার ওয়ার্ন করল, "বস, এই লোকটার সাথে পাঙ্গা নিও না। ভালো হবে না।" কিন্তু রাবণের তখন কপালই খারাপ — শুনলই না। মারীচকে নিয়ে গিয়ে মায়া দিয়ে দুই ভাইকে আশ্রম থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিল। বুড়ো শকুন জটায়ু আটকাতে এসেছিল — তাকে মেরে, রাবণ সীতাকে তুলে নিয়ে চম্পট।

ফিরে এসে রাম দেখলেন — মরণাপন্ন জটায়ু, আর সীতা গায়েব। পুরো ভেঙে পড়লেন। কান্নায় ভেঙে জটায়ুর শেষকৃত্য করলেন। তারপর সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে দেখা কবন্ধ নামের এক ভয়ংকর দেখতে রাক্ষসের সাথে। তাকেও খতম, আর মুক্তি দেওয়ায় সে গেল স্বর্গে। যাওয়ার আগে কবন্ধ টিপ দিয়ে গেল — "শবরীর কাছে যাও।" শবরী রামকে যত্ন করে আপ্যায়ন করলেন। আর পম্পা হ্রদের ধারেই দেখা হল — হনুমানের সাথে।

হনুমানের গাইডেন্সে রামের আলাপ হল সুগ্রীবের সাথে। দুজনে যে যার দুঃখের গপ্পো শেয়ার করলেন। সুগ্রীবের দাদা বালী এত পাওয়ারফুল যে, রাম আদৌ তাকে হারাতে পারবেন কিনা — সেই নিয়ে সুগ্রীবের একটু ডাউট ছিল। বললেন, "তুমি পারবে তো?" কনফিডেন্স দিতে রাম পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে দুন্দুভির বিশাল মৃতদেহ দশ যোজন দূরে ছিটকে দিলেন, আর একটা মাত্র তিরে সাতটা শালগাছ ফুঁড়ে পাহাড় পেরিয়ে পাতাল অবধি গেঁথে দিলেন। সুগ্রীবের ডাউট ক্লিয়ার।

দুজনে গেলেন কিষ্কিন্ধায়। সুগ্রীব হাঁক দিতেই বালী বেরিয়ে এল, আর রাম তাকে যুদ্ধে শেষ করে সুগ্রীবকে রাজা বানিয়ে দিলেন। এবার সীতাকে খুঁজতে সুগ্রীব চারদিকে স্কোয়াড পাঠালেন। শকুন সম্পাতির টিপ-অফে হনুমান একশো যোজন সমুদ্র এক লাফে পার করে পৌঁছলেন লঙ্কায়।

সেখানে অশোকবনে বসে থাকা সীতাকে খুঁজে পেলেন। চেনার জন্যে রামের দেওয়া একটা চিহ্ন দেখিয়ে সব আপডেট দিলেন, সীতাকে ভরসা দিলেন। তারপর গেট ভেঙে, পাঁচ সেনাপতি আর সাত মন্ত্রীপুত্রকে শেষ করে, অক্ষকে গুঁড়িয়ে — ইচ্ছে করেই ধরা দিলেন। ব্রহ্মার বরের জোরে বাঁধন যে তাঁর কাছে কিছুই না, সেটা জেনেই। শেষে গোটা লঙ্কা জ্বালিয়ে — সীতাকে বাঁচিয়ে — ফিরে এসে রামকে গুড নিউজটা দিলেন: "সীতাকে পেয়েছি।"

ব্যস, রাম আর দেরি করলেন না। সুগ্রীবকে নিয়ে সোজা সমুদ্রের ধারে। সূর্যের মতো জ্বলন্ত তির ছুঁড়ে গোটা সমুদ্রকে কাঁপিয়ে দিলেন। সমুদ্র নিজে হাজির হয়ে রাস্তা বাতলে দিল, আর নল বানিয়ে দিল সেই বিখ্যাত ব্রিজ। সেই সেতু পেরিয়ে লঙ্কায় ঢুকে রাম যুদ্ধে রাবণকে শেষ করলেন, আর বিভীষণকে বসিয়ে দিলেন লঙ্কার সিংহাসনে।

তিন লোক, দেবতা-ঋষি সবাই খুশিতে রামের জয়গান গাইল। রাম দেবতাদের থেকে বর নিয়ে যুদ্ধে নিহত সব বানরসেনাকে জ্যান্ত করলেন। তারপর উড়ন্ত পুষ্পক রথে চেপে সোজা নন্দিগ্রাম। সেখানে ভাইদের সাথে মিলে নিজের জটাজুট সব খুলে ফেললেন। সীতাও ফেরত, রাজ্যও ফেরত। ফুল সার্কল।

আর তারপর? রামের রাজত্বে প্রজারা সুখী, পেট ভরা, কোনো রোগ নেই, দুর্ভিক্ষ নেই, কোনো মায়ের আগে ছেলে মরে না, কোনো বউ বিধবা হয় না। কৃতযুগের মতো শান্তি। অনেক অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন, দিকে দিকে রাজবংশ বসাবেন। এগারো হাজার বছর রাজত্ব করে শেষে রাম ফিরবেন ব্রহ্মলোকে।

নারদ শেষে বললেন — "এই গপ্পো যে শোনে বা পড়ে, তার সব পাপ ধুয়ে যায়, আয়ু বাড়ে, পরলোকে শান্তি। বেদের সমান এই কাহিনি।"

ব্যস, এটুকুই ছিল ট্রেলার, ভাই। পুরো রামায়ণটা এক নিঃশ্বাসে। পরের সর্গ থেকে শুরু হবে আসল গপ্পো — ডিটেলে, সিন বাই সিন। পেজটা ফলো করে রাখুন, একটাও পর্ব মিস করবেন না।

আপনার মতে রামের কোন গুণটা আজকের দিনে সবচেয়ে রেয়ার? কমেন্টে লিখুন

উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.১

সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)