BONGরামায়ণ
বালকাণ্ড · সর্গ ৩

চোখ বুজলেন, আর গোটা সিনেমাটা চলতে লাগল

অচিন্ত্যরূপ রায় · ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বালকাণ্ড · সর্গ ৩ — চোখ বুজলেন, আর গোটা সিনেমাটা চলতে লাগল

উপস্পৃশ্যোদকং সম্যঙ্মুনিঃ স্থিত্বা কৃতাঞ্জলিঃ।
প্রাচীনাগ্রেষু দর্ভেষু ধর্মেণান্বেষতে গতিম্॥

(নিয়ম মেনে জল ছুঁয়ে, হাতজোড় করে, পুবমুখো কুশের আসনে বসে মুনি ধ্যানে খুঁজতে লাগলেন গোটা কাহিনির গতিপথ।)

ভাই, গত এপিসোডে ব্রহ্মা বাল্মীকিকে অ্যাসাইনমেন্টটা দিয়ে গেছেন — "গোটা রামায়ণটা লিখে ফেল।" এবার বাল্মীকি বসলেন আসল কাজে। কিন্তু এত বিশাল একটা কাহিনি, শুরুটা হবে কোত্থেকে?

প্রথমে নিয়ম মেনে এক চুমুক জল খেলেন। তারপর কুশ-ঘাসের আসনে, পুবমুখো হয়ে, হাতজোড় করে ঢুকে গেলেন গভীর ধ্যানে। টার্গেট একটাই — গোটা গল্পটায় ভেতর থেকে অ্যাক্সেস পাওয়া।

আর ভাই, এখানেই ম্যাজিকটা হল।

ব্রহ্মার দেওয়া দিব্যদৃষ্টির জোরে, বাল্মীকি যেই চোখ বুজলেন — গোটা রামায়ণটা তাঁর মাথার ভেতর একটা ফুল-লেংথ সিনেমার মতো চলতে শুরু করল। সিন বাই সিন। আর শুধু যেটুকু নারদ বলেছিলেন তা-ই নয় — যা যা তিনি জানতেনই না, এমনকি যা তখনও ঘটেইনি, সব ভেসে উঠল চোখের সামনে। লাইভ।

কী কী দেখলেন? পুরো রিল-টা একবার ফাস্ট-ফরওয়ার্ডে দেখে নিন —

রামের জন্ম। ছোট্ট থেকেই সবার আদরের, সবার ভালোবাসার ছেলে। তারপর ঋষি বিশ্বামিত্রের সাথে সেই রোমাঞ্চকর জার্নি — পথে কত অ্যাডভেঞ্চার। জনকের রাজসভায় শিবের সেই বিশাল ধনুক — যেটা রাম মড়াৎ করে ভেঙে ফেললেন, আর জিতে নিলেন সীতাকে। বিয়ে কমপ্লিট।

তারপর ফেরার পথে "দুই রামের" সেই ফেমাস ঝামেলা — পরশুরামের সাথে টক্কর, যেখানে দাশরথি রামের আসল জোরটা সবাই টের পেল।

এরপরই মুড চেঞ্জ। রামের রাজ্যাভিষেকের তোড়জোড়, আর তার মধ্যেই কৈকেয়ীর সেই শয়তানি চাল। অভিষেক ভেস্তে গেল, রামের বনবাস, শোকে দশরথের মৃত্যু, গোটা অযোধ্যার কান্না। নিষাদরাজ গুহের সাথে দেখা, গঙ্গা পেরোনো, চিত্রকূটে কুটির, ভরতের ফিরে আসা, খড়ম নিয়ে নন্দীগ্রামে রাজত্ব।

তারপর দণ্ডকারণ্যের গভীরে — একের পর এক ঋষির সাথে দেখা, অনসূয়ার দেওয়া সেই দিব্য প্রসাধন, শূর্পণখার নাক-কান কাটা, খর-দূষণ-ত্রিশিরার নিধন, রাবণের এন্ট্রি, মারীচের মায়া, আর সীতাহরণ। জটায়ুর মৃত্যু, রামের আর্তনাদ, কবন্ধ-বধ, পম্পার ধারে শবরী আর হনুমান।

ঋষ্যমূকে সুগ্রীবের সাথে বন্ধুত্ব, বালী-বধ, সুগ্রীবের রাজ্যলাভ, তারার কান্না। বর্ষার জন্য অপেক্ষা, তারপর রামের রাগ, চারদিকে বানরসেনা পাঠানো, সম্পাতির খবর, আর হনুমানের সেই বিশাল সমুদ্রলাফ।

লঙ্কায় ঢুকে অশোকবনে সীতার সাথে দেখা, চেনার আংটি, রাক্ষসীদের হুমকি, ত্রিজটার স্বপ্ন, লঙ্কাদহন, আর ফিরে এসে রামকে গুড নিউজ।

তারপর সমুদ্রের সাথে বোঝাপড়া, নলের সেতু, লঙ্কায় চড়াও হওয়া। বিভীষণের সাথে জোট, কুম্ভকর্ণের মৃত্যু, মেঘনাদের নিধন, আর শেষমেশ — রাবণ-বধ। সীতা উদ্ধার, বিভীষণের অভিষেক, পুষ্পক রথে অযোধ্যায় ফেরা, ভরতের সাথে মিলন, রামের রাজ্যাভিষেক।

এবার ধরুন, গল্পটা তো এখানেই "হ্যাপিলি এভার আফটার" হয়ে শেষ হওয়ার কথা।

কিন্তু না, ভাই।

বাল্মীকির ধ্যানের সিনেমাটা ওখানে থামল না। দিব্যদৃষ্টি তাঁকে এমন কিছু দেখাল যা তখনও পৃথিবীতে ঘটেইনি — ভবিষ্যতের পাতা। আর সেখানেই লুকিয়ে ছিল গল্পের সবচেয়ে কষ্টের মোড়টা: রাজা হয়ে ফেরার পরেও, একদিন এই রামকেই — সীতাকে সরিয়ে দিতে হবে।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। যে রাম সমুদ্র পেরিয়ে, রাবণকে মেরে সীতাকে ফিরিয়ে আনলেন — গল্পের শেষ চ্যাপ্টারে সেই রামকেই দিতে হবে সবচেয়ে কঠিন মূল্য। কিন্তু সে গল্প অনেক পরের, অনেক গভীরের।

এই গোটা ক্যানভাসটা — অতীত, বর্তমান, এমনকি যে ভবিষ্যৎ তখনও আসেনি — সব বাল্মীকি একটা ধ্যানে দেখে নিলেন। আর তার পর, শ্লোকের পর শ্লোকে গড়ে উঠতে লাগল জগতের প্রথম মহাকাব্য।

কিন্তু একটা প্রশ্ন রয়েই গেল — এত বিশাল কাব্য তো রচিত হল, কিন্তু সে সব শ্লোক গাইবে কে? সারা পৃথিবীর সামনে কে পৌঁছে দেবে এই কাহিনি?

পরের সর্গে আসছে দুই রহস্যময় গায়ক — কুশ আর লব, যাদের গান শুনে চমকে যাবেন স্বয়ং রাম।

অপেক্ষায় থাকুন এবং ভালো লাগলে প্লিজ শেয়ার করুন।

উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.৩

সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)