পৃথিবীর সবচেয়ে ফ্ল্যাশি শহর: অযোধ্যা

অযোধ্যা নাম নগরী তত্রাসীল্লোকবিশ্রুতা।
মনুনা মানবেন্দ্রেণ যা পুরী নির্মিতা স্বয়ম্॥
(সেখানে ছিল জগদ্বিখ্যাত এক নগরী, নাম অযোধ্যা — যে পুরী মানবশ্রেষ্ঠ মনু স্বয়ং নির্মাণ করেছিলেন।)
ভাই, এতক্ষণ তো হল সেটআপ — কবি, কবিতা, গায়ক। এবার আসল গল্প শুরু। একদম গোড়া থেকে।
এই যে মহাকাব্য, রামায়ণ — এটা আসলে একটা বংশের গল্প। মহাপরাক্রমী এক রাজবংশ — ইক্ষ্বাকু বংশ। প্রজাপতির বংশধর — গোটা পৃথিবীটাই নাকি এক সময় তাদের হাতে ছিল। এই বংশেই ছিলেন সগর — সেই যে গল্পে-শোনা রাজা, যিনি নাকি সমুদ্রটাকেই খুঁড়ে বার করেছিলেন, আর যাঁর ছিল ষাট হাজার ছেলে! (এই সগরের গল্প পরে আসবে, জমিয়ে রাখলাম।)
তো গায়ক বলছে — "আমি পুরো গল্পটা গোড়া থেকে শোনাব, একটুও বাদ না দিয়ে। ধর্ম, অর্থ আর কাম — জীবনের তিনটি লক্ষ্যের কথাই এই গল্পে আছে। মন দিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে শুনুন।"
তো, গল্পের শুরুটা হচ্ছে একটা দেশের কথা দিয়ে। নাম — কোশল। সরযূ নদীর ধারে বিশাল, সুখী, সমৃদ্ধ একটা দেশ। ধন-ধান্যে-পুষ্পে ভরা। আর সেই কোশলের রাজধানী?
অযোধ্যা।
এমন একটা শহর, ভাই, যেটা বানিয়েছিলেন স্বয়ং মনু — মানবজাতির আদিপুরুষ। সাইজটা শুনুন — বারো যোজন লম্বা, তিন যোজন চওড়া। ছিমছাম, প্ল্যান করে কাটা সব রাস্তা। আর শহরের মেইন রোড-টা? সবসময় ফুল ছড়ানো, জল টল ছিটিয়ে একেবারে ঠাণ্ডা করে রাখা। সে রাস্তা এমন, যে আজকের সব স্মার্ট সিটিও লজ্জা পাবে।
চলুন, একটু ঘুরিয়ে দেখা যাক শহরটা।
শহরে ঢোকার গেটগুলো সব বিশাল বিশাল। বাজারগুলো গোছানো, ভেতরে সব মালপত্র সাজানো। যা চাইবেন তাই পাওয়া যাবে — সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র, সব ধরনের কারিগর। গায়ক-বাজনদার-গল্পবলিয়েতে গমগম করছে চারদিক। উঁচু উঁচু মিনারে পতাকা উড়ছে, আর তার মাথায় বসানো "শতঘ্নী" — মানে একসাথে শয়ে শয়ে শত্রু মারার মতো ভয়ংকর অস্ত্র। ডিফেন্স একদম টপ-নচ।
জায়গায় জায়গায় নাচ-গানের দল, বাগান, আমের বাগিচা। চারদিক ঘেরা পেল্লায় প্রাচীর, আর তার বাইরে এত গভীর পরিখা যে সেই পরিখা পেরিয়ে শহরে ঢোকার কথা কোনো শত্রু ভাবতেই পারবে না। পুরো আনব্রেকেবল ফোর্ট, বুঝলেন তো। ভেতরে ঘোড়া, হাতি, গরু, উট, গাধা — একেবারে গিজগিজ করছে।
আশপাশের নানা রাজ্যের রাজারা সব লাইন দিয়ে এসে ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছে। নানা দেশের ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসেছে। রত্ন দিয়ে বানানো প্রাসাদ, ঝকঝকে চূড়া — পুরো শহরটাকে দেখতে যেন ইন্দ্রের স্বর্গপুরী অমরাবতী। দাবার বোর্ডের মতো নিখুঁত গ্রিডে সাজানো, একটার গায়ে আরেকটা বাড়ি — মাঝে এক ইঞ্চিও ফাঁক নেই। গুদাম ভর্তি সেরা শালি চাল, আর জল এমন মিষ্টি যেন আখের রস। ঢোল, মৃদঙ্গ, বীণা — বাজনার মিঠে আওয়াজে ভরে রয়েছে চতুর্দিক। শর্টে, এর সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো আর কোনো শহর পৃথিবীতে ছিল না।
আর এই স্বর্গের মতো শহরের ঠিক মাঝখানে, দেবরাজ ইন্দ্রের মতো রাজত্ব করছেন এক রাজা — দশরথ।
এবার একটা জিনিস বলি, যার জন্যে আসলে এই শহর গ্রেট — শুধু বিল্ডিং নয়, এর লোকজন।
দশরথ শহরটা ভরিয়ে রেখেছিলেন হাজার হাজার দুর্ধর্ষ রথী-যোদ্ধায়। কিন্তু এদের একটা কোড অফ অনার ছিল, ভাই। এরা কখনো এমন কারো ওপর তির ছুঁড়ত না যে একা, যে দলছুট, যে পরিবারের একমাত্র ভরসা, যে লুকিয়ে আছে, বা যে পালাচ্ছে। মানে, দুর্বলের ওপর কখনো নয়। বদলে এরা খালি হাতে, বা ধারালো অস্ত্র নিয়ে, জঙ্গলে গিয়ে সিংহ-বাঘ-শুয়োরের সাথে লড়ত। আসল সাহস এদেরই।
আর ছিলেন সেরা সব ব্রাহ্মণ — যাঁরা সর্বদা যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে রাখতেন, ছিলেন বেদ-শাস্ত্রে পণ্ডিত, সত্যবাদী, আর দান করতেন হাজারে হাজারে। মহান সব ঋষিদের মতো গুণী মানুষ।
ব্যস। আর কী চাই? ধন আছে, শক্তি আছে, সৌন্দর্য আছে, ভালো মানুষ আছে — অযোধ্যার কিছুরই যেন অভাব নেই। একেবারে পারফেক্ট রাজ্য, পারফেক্ট রাজা।
কিন্তু এই পারফেকশনের আড়ালেও একটা চিন্তা লুকিয়ে ছিল। রাজা দশরথের জীবনে একটা জিনিসের কমতি — যেটা নিয়ে পরের সর্গ থেকে শুরু হবে আসল ড্রামা।
পরের এপিসোডে আলাপ হবে রাজা দশরথের সাথে — আর জানা যাবে, এত বড় সাম্রাজ্যের মালিকের ঠিক কী নিয়ে এত দুশ্চিন্তা।
Bong রামায়ণ-এ থেকে যান ভাই, আর ভালো লাগলে বন্ধু-বান্ধবকেও পড়ান।
উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.৫
সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)