BONGরামায়ণ
বালকাণ্ড · সর্গ ৬

রাজা দশরথের অযোধ্যা — যে শহরে কেউ মিথ্যে বলত না

অচিন্ত্যরূপ রায় · ৫ অক্টোবর ২০২৬
বালকাণ্ড · সর্গ ৬ — রাজা দশরথের অযোধ্যা — যে শহরে কেউ মিথ্যে বলত না

সুগ্রীব। ব্যাটা, তুই ভালো করে ধারাবাহিক-রূপে আদ্যোপান্ত পর্যায় পরম্পরা সব বলবি কি না?

রাম। তারপরে কি হল শুনি — ততঃ কিম্?

— সুকুমার রায়, লক্ষ্মণের শক্তিশেল


আজ্ঞে, বলছি বলছি। অযোধ্যার রাজা আর তাঁর প্রজাদের কথা শুনে নিন আগে — বাল্মীকি মুনি যেমন বলেছেন:

তস্মিন্ পুরবরে হৃষ্টা ধর্মাত্মানো বহুশ্রুতাঃ।
নরাস্তুষ্টা ধনৈঃ স্বৈঃ স্বৈরলুব্ধাঃ সত্যবাদিনঃ॥

(সেই শ্রেষ্ঠ নগরে মানুষ ছিল সুখী, ধার্মিক, পণ্ডিত — নিজের নিজের ধনে সন্তুষ্ট, নির্লোভ, সত্যবাদী।)

ভাই, গত এপিসোডে অযোধ্যার বাড়িঘর-পাঁচিল-বাজার সব তো ঘুরে দেখা হল। কিন্তু শহর তো আর শুধু ইট-কাঠ-পাথরে তৈরি হয় না — হয় তার মানুষে। আর সেদিক থেকে অযোধ্যা ছিল এক্কেবারে পারফেক্ট।

আগে রাজামশাইয়ের সিভিটা দেখুন। দশরথ রাজত্ব করতেন একদম আদিপুরুষ মনুর স্টাইলে। বেদ জানেন, দূরদর্শী, শহর-গ্রাম সবার প্রিয়। ইক্ষ্বাকু বংশের সেরা রথী, যাগযজ্ঞে কামাই নেই, ধর্মে অটল। তিন লোকে নামডাক — ঋষিদের মতোই এক রাজর্ষি। শত্রু শেষ করেছেন অনেক, আবার নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকেও রেখেছেন ফুল কন্ট্রোলে — যেটা শত্রু হারানোর চেয়ে ঢের কঠিন কাজ। বন্ধু অগুনতি। আর ধনে? স্বয়ং কুবেরের সঙ্গে পাল্লা দেন। আজকের দিনে হলে, এ লিংকডইন প্রোফাইল স্ক্রল করে শেষ করা যেত না। শর্টে, ইন্দ্র যেমন অমরাবতীতে, দশরথ তেমন অযোধ্যায়।

এবার আসল চমক। সেখানকার প্রজারা।

এই শহরে সবাই সুখী, ধার্মিক, পণ্ডিত। সবাই সত্যবাদী, কারও লোভ নেই — যার যা আছে, তাতেই খুশ। এমন একটা গেরস্ত বাড়িও ছিল না, যার গোয়ালে গরু নেই, আস্তাবলে ঘোড়া নেই, গোলায় ধান নেই। আর যেটা শুনলে চোখ কপালে উঠবে — গোটা অযোধ্যা খুঁজে একটাও লম্পট পাওয়া যেত না। একটাও কিপ্টে না, একটাও নিষ্ঠুর না, একটাও মূর্খ না। মিথ্যেবাদী? ছিল না। ঠগ? ছিল না।

মানে ভাবুন ভাই, পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে শিস দেওয়ার মতো একটা ছেলেও নেই। অযোধ্যায় তখনও চা আসেনি — এলে দেখা যেত, চায়ের দোকানে বিল মেটানোর সময় সবাই আগে নিজের ট্যাঁকে হাত দিচ্ছে। পাশের বাড়ির নতুন রথ দেখে কারও গা জ্বলে না। অযোধ্যায় থানা খুললে দারোগাবাবুকে সারাদিন বসে মাছি তাড়াতে হত।

আর সাজগোজ? সবার কানে দুল, মাথায় মুকুট, গলায় হার, হাতে বাজুবন্ধ-আংটি, বুকে সোনার বর্ম। আমরা বিয়েবাড়িতে যা পরে যাই, অযোধ্যায় সেটা ছিল রোজকার ড্রেস কোড। কেউ নোংরা নয়, সবার গায়ে চন্দন-আতর, কারও পাতে খারাপ খাবার নেই। আর এত গয়নার মাঝেও সবচেয়ে দামি গয়নাটা ছিল সংযম — সেটাও কারও কম পড়েনি।

ব্রাহ্মণরা সবাই যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে রাখতেন, দান করতেন হাজারে হাজারে, পড়াশোনায় ডুবে থাকতেন — অথচ নিজে দান নেওয়ার বেলায় ভারী সংকোচ। দিতে উদার, নিতে লজ্জা। কেউ হিংসুটে নয়, কেউ অকর্মণ্য নয়, কেউ মনমরা বা চঞ্চল নয়। নারী-পুরুষ সবাই সুশ্রী, সবাই দীর্ঘায়ু, অতিথি আর দেবতাকে সমান যত্নে পুজো করে। আর প্রত্যেকে — প্রত্যেকে — রাজার প্রতি বিশ্বস্ত। সমাজে যে যার জায়গায় যে যার কাজ মন দিয়ে করত — পুরো সিস্টেমটা চলত ঘড়ির কাঁটার মতো, ঠিক যেন মনুর আমল ফিরে এসেছে।

আর শহরের ডিফেন্স? সে একেবারে সিংহের গুহা — ঠাসা দুর্ধর্ষ, পোড়খাওয়া সব যোদ্ধায়। আস্তাবলে সব ইমপোর্টেড ব্রিড — বাহ্লীক, বনায়ু, কাম্বোজ, সিন্ধুপারের এলিট ঘোড়া, এক-একটা ইন্দ্রের ঘোড়ার সঙ্গে টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর হাতি? সে তো চলমান পাহাড় — মত্ত সব গজরাজ, বিন্ধ্য আর হিমালয়ে জন্মানো, খোদ দিগ্‌হস্তী অঞ্জন আর বামনের বংশধর। মানে হাতিদেরও পেডিগ্রি সার্টিফিকেট ছিল!

আর জানেন, "অযোধ্যা" নামটার মানে কী? — "যাকে যুদ্ধে জয় করা যায় না।" কোনো বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন নয়, নামটা রীতিমতো অর্জন করা। শহরের গেট থেকে দু-যোজন দূর পর্যন্ত কোনো শত্রুর সাধ্য ছিল না ঘেঁষে। গেটে মজবুত খিল, ভেতরে হাজার হাজার মানুষ, ঝলমলে প্রাসাদ — এমনই এক অজেয় নগরী চালাতেন দেবরাজ-সমান রাজা দশরথ।

ধন আছে, শক্তি আছে, সৎ প্রজা আছে, অজেয় দুর্গ আছে। শুনে মনে হচ্ছে না, যেন রূপকথা? আক্ষরিক অর্থেই কোনো খামতি নেই।

কিন্তু ভাই, রাজা যত বড়ই হোন, একা হাতে তো আর গোটা সাম্রাজ্য চালানো যায় না। পেছনে চাই একটা শার্প টিম — বিশ্বাসী মন্ত্রী, বিচক্ষণ উপদেষ্টা।

পরের এপিসোডে আলাপ হবে দশরথের সেই টিমের সাথে — আট মন্ত্রী, দুই মহাঋষি পুরোহিত, আর এক গোয়েন্দা-নেটওয়ার্ক, যার চোখ এড়িয়ে রাজ্যের একটা পাতাও নড়ত না। কাহিনি সবে জমছে, ভাই। পরের সর্গে দেখা হচ্ছে — মিস করতে না চাইলে ফলো করে রাখুন Bong রামায়ণ।

উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.৬

সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)

#অযোধ্যা#দশরথ