BONGরামায়ণ
বালকাণ্ড · সর্গ ৭

সিংহাসনের পেছনের আসল মাথারা

অচিন্ত্যরূপ রায় · ৮ অক্টোবর ২০২৬
বালকাণ্ড · সর্গ ৭ — সিংহাসনের পেছনের আসল মাথারা

ধৃষ্টির্জয়ন্তো বিজয়ঃ সিদ্ধার্থো অর্থসাধকঃ।
অশোকো মন্ত্রপালশ্চ সুমন্ত্রশ্চাষ্টমোঽভবৎ॥

(ধৃষ্টি, জয়ন্ত, বিজয়, সিদ্ধার্থ, অর্থসাধক, অশোক, মন্ত্রপাল — আর অষ্টম জন ছিলেন সুমন্ত্র।)

ভাই, রাজা যতই গ্রেট হোন, একা হাতে গোটা সাম্রাজ্য চালানো যায় না। পেছনে চাই একটা শার্প, বিশ্বাসী টিম। আর দশরথের টিমটা ছিল এক্কেবারে লেজেন্ডারি।

প্রথমে আট মন্ত্রী — ধৃষ্টি, জয়ন্ত, বিজয়, সিদ্ধার্থ, অর্থসাধক, অশোক, মন্ত্রপাল, আর — সুমন্ত্র। শুনে মনে হচ্ছে না, যেন একটা ক্রিকেট টিমের ব্যাটিং অর্ডার? (আর এই আট নম্বরে নামা সুমন্ত্রের নামটা মাথায় রাখুন, ভাই — ইনি পরে বারবার ফিরবেন, আর একেবারে ম্যাচ-জেতানো সব মুহূর্তে।) এরা সবাই একশো শতাংশ সৎ, রাজকার্যে নিবেদিতপ্রাণ। সঙ্গে দুই প্রধান পুরোহিত — মহাঋষি বশিষ্ঠ আর বামদেব, আর আরও কয়েকজন উপদেষ্টা।

এবার এদের বায়োডেটাটা শুনুন। শাস্ত্রে পণ্ডিত, সাহসে অটল, কাজে পরিশ্রমী, কথায় একদম পাকা। ক্ষমতা আছে, ধৈর্য আছে, নামডাক আছে — অথচ মুখে সবসময় হাসি। আর সবচেয়ে বড় কথা — রাগে হোক, লোভে হোক, বা নিজের সুবিধের জন্যই হোক, এরা কোনোদিন একটাও মিথ্যে কথা বলতেন না। (এই লাইনটা পড়ে যদি কারও আজকের কথা মনে পড়ে, সে দায় বাল্মীকির নয়।)

এবার আসল চমক — এদের ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক।

নিজের রাজ্যে হোক বা বাইরে — এমন কিছুই ঘটত না, যা এই মন্ত্রীরা জানতেন না। শুধু যা ঘটে গেছে তা-ই নয়; যা এখন ঘটছে, এমনকি যা কেউ মনে মনে করার প্ল্যান করছে — সব খবর গুপ্তচর মারফত এঁদের টেবিলে পৌঁছে যেত। মানে ভাবুন, আপনি মনে মনে ফন্দি আঁটছেন, আর মন্ত্রীমশাই ততক্ষণে সেটা পড়ে ফেলেছেন। আজকের যে কোনো গোয়েন্দা সংস্থা এঁদের দেখলে স্যালুট ঠুকত।

আর লয়্যালটি? এমন লেভেলের যে, দোষ করলে এঁরা নিজের ছেলেকেও শাস্তি দিতে পিছপা হতেন না। ন্যায়ের প্রশ্নে নো আত্মীয়তা, নো সুপারিশ, নো "আমার ভাইপো তো"।

তবে এঁরা শুধু কড়া ছিলেন না, বিচারও করতেন একদম ন্যায্য। কোষাগার ভরাতেন, সেনাবাহিনী সামলাতেন — কিন্তু কোনো নিরীহ লোকের, এমনকি কোনো শত্রুরও, বিনা দোষে এতটুকু ক্ষতি করতেন না। অপরাধ কতটা গুরুতর, সেটা ভালো করে মেপে তবেই শাস্তি।

এমন বিচারকদের সামনে গোটা রাজ্যে কারও সাহস ছিল না মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার। দুষ্টু লোক নেই, পরস্ত্রীর দিকে কেউ চোখ তোলে না, গোটা দেশ শান্তিতে। মন্ত্রীদের পোশাক ফিটফাট, গয়না সুন্দর, চরিত্র নিখুঁত। আর বিদেশেও এঁদের নাম — দৃঢ়চেতা, সাহসী মানুষ হিসেবে। মানে ইন্টারন্যাশনাল রেপুটেশনও টপ ক্লাস।

এমন একটা ড্রিম টিম পাশে থাকায় দশরথকে আর পায় কে! গুপ্তচরের চোখ সবসময় সজাগ, প্রজাদের খুশি রেখে ধর্মমতে রাজত্ব — এমন রাজার সমকক্ষ শত্রুই ছিল না, তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া তো দূরের কথা। চারপাশে এমন বুদ্ধিমান, দক্ষ উপদেষ্টাদের নিয়ে দশরথ জ্বলজ্বল করছিলেন — যেন উদীয়মান সূর্য, চারদিকে তার ঝলমলে রশ্মি।

সব পারফেক্ট। রাজ্য পারফেক্ট, প্রজা পারফেক্ট, মন্ত্রিসভা পারফেক্ট।

কিন্তু পরের সর্গের একেবারে প্রথম শ্লোকেই বাল্মীকি দেখিয়ে দেবেন, এই গোটা ছবিতে একটাই ফাটল। একটাই অপূর্ণতা, যেটা রাজা দশরথকে ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছিল — তাঁর কোনো সন্তান নেই। এত বড় ইক্ষ্বাকু বংশটা এগিয়ে নিয়ে যাবে কে?

আর এই একটা দুশ্চিন্তা থেকেই দশরথ নেবেন এক বিরাট সিদ্ধান্ত — এক মহাযজ্ঞ করার ডিসিশন। আর সেই সূত্রেই সুমন্ত্র শোনাবেন এক রহস্যময় বনবাসী ঋষির গল্প, যাঁকে ছাড়া নাকি এই যজ্ঞ সম্পূর্ণই হবে না। (বলেছিলাম না, সুমন্ত্র ফিরবেন!)

পরের সর্গ থেকেই শুরু হচ্ছে আসল গল্প — অশ্বমেধ যজ্ঞের সিদ্ধান্ত, আর ঋষি ঋষ্যশৃঙ্গের অদ্ভুত কাহিনি।

তাহলে, দেখা হচ্ছে পরের সর্গে — মিস করতে না চাইলে ফলো করে রাখুন Bong রামায়ণ।

উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.৭

সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)

#দশরথ#সুমন্ত্র