যে ছেলে মিষ্টিকে ভাবল জঙ্গলের ফল

তানি চাস্বাদ্য তেজস্বী ফলানীতি স্ম মন্যতে।
অনাস্বাদিতপূর্বাণি বনে নিত্যনিবাসিনাম্॥
(সেগুলো চেখে তেজস্বী ঋষিপুত্র ভাবলেন — এ নিশ্চয়ই কোনো ফল; চিরকাল বনে-থাকা মানুষ এমন স্বাদ আগে কখনো পায়নি।)
ভাই, দশরথ যখন বললেন "পুরো ডিটেলে শোনাও", সুমন্ত্র তখন আসল গল্পটা শুরু করলেন। আপনারাও শুনুন, কীভাবে অঙ্গরাজ রোমপাদ ঋষ্যশৃঙ্গকে জঙ্গল থেকে বার করে এনেছিলেন।
রোমপাদের পুরোহিত আর মন্ত্রীরা রাজাকে বললেন — "মহারাজ, একেবারে ফুলপ্রুফ প্ল্যান রেডি। ব্যাপারটা হল, এই ঋষ্যশৃঙ্গ বনে থাকেন, তপস্যা আর বেদপাঠেই মগ্ন। নারী কী, ইন্দ্রিয়সুখ কাকে বলে — কিচ্ছু জানেন না। তাই আমরা কয়েকজন রূপসী গণিকাকে পাঠিয়ে দেব। তারা নানা কায়দায় লোভ দেখিয়ে ঋষ্যশৃঙ্গকে এখানে নিয়ে আসবে।"
রাজা বললেন — "ঠিক আছে, তাই হোক।"
ব্যস, অপারেশন হানি-ট্র্যাপ চালু।
তো সেরা সেরা গণিকারা ঢুকলেন গভীর জঙ্গলে। আশ্রমের কাছেই ঘাপটি মেরে রইলেন — যদি একবার ঋষির দেখা মেলে। কিন্তু সমস্যা একটাই — ঋষ্যশৃঙ্গ তো আশ্রমের বাইরে পা-ই রাখেন না! বাবাকে নিয়েই তাঁর গোটা জগৎ। ভাবুন ভাই, জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত অন্য একটি মানুষও তিনি দেখেননি — না পুরুষ, না নারী। শহর-গ্রামের কিছুই তাঁর চোখে পড়েনি। পুরো আইসোলেটেড।
তো, একদিন ঘুরতে ঘুরতে ঋষ্যশৃঙ্গ এসে পড়লেন ঠিক যেখানে ওই সুন্দরীরা দাঁড়িয়ে। আর জীবনে প্রথমবার তিনি দেখলেন — নারী।
রঙিন বাহারি পোশাক, মিষ্টি গলায় গান গাইতে গাইতে মেয়েরা সবাই এগিয়ে এসে বলল — "তুমি কে গো? কীভাবে দিন কাটাও? ও ব্রাহ্মণ, আমাদের যে জানতে বড্ড ইচ্ছে করছে! বলো না, এই ভয়ংকর নির্জন জঙ্গলে একা একা ঘুরছ কেন?"
আর ঋষ্যশৃঙ্গ? এমন রূপ তিনি জীবনে দেখেননি — এমন কামনা-জাগানো চেহারা! (অদৃষ্টরূপাস্তাস্তেন কাম্যরূপা বনে স্ত্রিয়ঃ)। বুকের ভেতর হঠাৎ উথলে উঠল এক অদ্ভুত ভালোলাগা, যার নামটাও তিনি জানেন না। কিন্তু তিনি জানেন শুধু একটা জিনিস — ভদ্রতা। আর তাই আলাপ শুরু করলেন সটান বাবার পরিচয় দিয়ে!
"আমার বাবা ঋষি বিভাণ্ডক, আমি তাঁরই নিজের ছেলে। আমার নাম ঋষ্যশৃঙ্গ — নাম আর কাজ, দুটোই দুনিয়াসুদ্ধ লোক জানে। কিন্তু তোমরা… তোমরা তো ভারি সুন্দর দেখতে! আমার আশ্রম কাছেই। চলো না, তোমাদের একটু আপ্যায়ন করি।"
মেয়েরা তো এক কথায় রাজি। সবাই মিলে আশ্রমে গেল। আর ঋষ্যশৃঙ্গ পুরো হোস্ট মোডে — "এই নাও অর্ঘ্য, এই নাও পা ধোয়ার জল, এই নাও আমাদের ফল-মূল।"
আপ্যায়ন তো নিল, মনে মনে মেয়েরাও তখন উতলা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ে কাঁপছে — যদি ঋষিবাবা এসে পড়েন! তাই তাড়াতাড়ি কেটে পড়ার প্ল্যান। বলল — "আমাদের কাছেও দারুণ ফল আছে গো, ব্রাহ্মণ! তোমার মঙ্গল হোক। এই নাও, এক্ষুনি খেয়ে দেখো।"
আর তারপর? বাল্মীকির নিজের কথায় —
ততস্তাস্তং সমালিঙ্গ্য সর্বা হর্ষসমন্বিতাঃ।
মোদকান্ প্রদদুস্তস্মৈ ভক্ষ্যাংশ্চ বিবিধাঞ্ শুভান্॥
(তারপর তারা সবাই মিলে মহানন্দে তাঁকে জড়িয়ে ধরল, আর হাতে তুলে দিল মোদক আর নানা রকমের ভালো ভালো খাবার।)
ঋষ্যশৃঙ্গ একটা মোদক মুখে দিয়েই থ! সারাজীবন বনের ফল-মূল খেয়ে বড় হওয়া ছেলে — এমন স্বাদ তিনি কোনোদিন পাননি। মনে মনে ভাবলেন, "বাহ্, এ আবার কোন গাছের ফল রে! এমন তো খাইনি কখনও!" বেচারা জানেনই না যে ওটা মিষ্টি — ফলই নয়!
খাওয়ানো শেষ হতেই মেয়েরা একটা অজুহাত দিল — "আমাদের একটা ব্রত আছে গো, এখন চলি।" আসল কারণ অবশ্য ওই — বাবার ভয়। কিন্তু তারা চলে যেতেই, ভাই, ঋষ্যশৃঙ্গের অবস্থা কাহিল। বুকের ভেতরটা কেমন আনচান করছে, কিছুতেই মন বসছে না, এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন মনমরা হয়ে। জীবনের প্রথম মন-খারাপ — আর তিনি বুঝতেই পারছেন না, হলটা কী।
পরদিন? সোজা আবার সেই জায়গায় হাজির। মেয়েরা তো তাঁকে আসতে দেখেই খুশিতে ডগমগ। এগিয়ে এসে বলল — "এবার আপনি আমাদের আশ্রমে চলুন! ওখানে আপ্যায়ন হবে আরও জমকালো, আরও স্পেশাল!"
কথাগুলো সোজা গিয়ে বিঁধল ঋষ্যশৃঙ্গের বুকে। তিনি আর না করলেন না — চললেন ওদের সাথে।
আর ঠিক যেই মুহূর্তে ওই মহাত্মাকে নিয়ে আসা হচ্ছে — হঠাৎ আকাশ ভেঙে নামল বৃষ্টি! খরায় পোড়া গোটা জগৎ ভিজে, জুড়িয়ে গেল। মানে ব্রাহ্মণরা যা প্রেসক্রিপশন লিখেছিলেন, রেজাল্ট এল এক্কেবারে অন-টাইম।
রাজা রোমপাদ ছুটে এলেন মুনিকে স্বাগত জানাতে। মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন, নিয়ম মেনে অর্ঘ্য দিলেন, তারপর করজোড়ে বললেন, "ব্রাহ্মণ, দয়া করে আমাদের ওপর রাগ করবেন না।" (বোঝাই যাচ্ছে, হানি-ট্র্যাপের গিল্টটা রাজামশাইয়ের মনেও খচখচ করছিল!)
তারপর অন্তঃপুরে নিয়ে গিয়ে, বিধিমতো নিজের মেয়ে শান্তাকে তুলে দিলেন ঋষ্যশৃঙ্গের হাতে। আর বাল্মীকি এখানে একটা দারুণ শব্দের খেলা খেলেছেন — "শান্তাং শান্তেন মনসা" — শান্তাকে সম্প্রদান করে রাজার মনও হল শান্ত।
আর এভাবেই, ভাই, মহাতেজস্বী ঋষ্যশৃঙ্গ বউ শান্তাকে নিয়ে অঙ্গ রাজ্যেই থেকে গেলেন — রাজসম্মানে, সব সাধ-আহ্লাদ মিটিয়ে।
কিন্তু সুমন্ত্রের গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ এই গোটা কাহিনির সঙ্গে দশরথের নিজের ভাগ্য জড়িয়ে আছে — সনৎকুমারের ভবিষ্যদ্বাণীর পরের অংশটাই যে দশরথকে নিয়ে।
পরের সর্গে জানা যাবে — কীভাবে এই ঋষ্যশৃঙ্গই এসে দাঁড়াবেন দশরথের যজ্ঞের কেন্দ্রে, আর খুলে যাবে পুত্রলাভের রাস্তা। পরের সর্গে দেখা হচ্ছে — মিস করতে না চাইলে ফলো করে রাখুন Bong রামায়ণ।
উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.৯
সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)