BONGরামায়ণ
বালকাণ্ড · সর্গ ১০

সনৎকুমারের ভবিষ্যদ্বাণী, চার ছেলে, আর ঋষিকে আনতে রাজার যাত্রা

অচিন্ত্যরূপ রায় · ১৮ অক্টোবর ২০২৬
বালকাণ্ড · সর্গ ১০ — সনৎকুমারের ভবিষ্যদ্বাণী, চার ছেলে, আর ঋষিকে আনতে রাজার যাত্রা

ইক্ষ্বাকূণাং কুলে জাতো ভবিষ্যতি সুধার্মিকঃ।
নাম্না দশরথো রাজা শ্রীমান্ সত্যপ্রতিশ্রবঃ॥

(ইক্ষ্বাকু বংশে জন্মাবেন এক পরম ধার্মিক রাজা — নাম তাঁর দশরথ, শ্রীমান, কথার খেলাপ করেন না।)

ভাই, সুমন্ত্র এবার এলেন ভবিষ্যদ্বাণীর শেষ পার্টে — আর সেটাই সবচেয়ে জরুরি। কারণ এখানে সনৎকুমার একেবারে নাম ধরে দশরথের কথা বলেছেন। ভাবুন একবার, যুগ যুগ আগের গল্পে রাজামশাইয়ের নামটা আগে থেকেই লেখা!

সুমন্ত্র বললেন — "শুনুন মহারাজ, সনৎকুমার বলেছিলেন: 'ইক্ষ্বাকু বংশে জন্মাবে দশরথ নামে এক ধর্মপ্রাণ রাজা — শ্রীমান, আর কথা দিলে সব সময় কথা রাখে। তার দোস্তি হবে অঙ্গরাজের সঙ্গে। সেই অঙ্গরাজের ঘরে জন্মাবে শান্তা নামে এক নামকরা মেয়ে, আর তাঁর এক ছেলেও হবে — নাম রোমপাদ। নামজাদা রাজা দশরথ সেই রোমপাদের কাছে গিয়ে বলবে — "শোনো ভাই, আমার কোনো ছেলেপুলে নেই। তুমি যদি পারমিশন দাও, শান্তার বর আমার বংশ বাঁচাতে একটা যজ্ঞ করে দিক।" বুদ্ধিমান রোমপাদ ব্যাপারটা মাথায় একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভেবে, শান্তার বরকে পাঠিয়ে দেবে। আর দশরথ সেই ব্রাহ্মণকে পেয়ে, টেনশন-ফ্রি হয়ে, ফুরফুরে মনে যজ্ঞের তোড়জোড় শুরু করবে।'"

(একটা ছোট্ট খটকা আছে, ভাই। এখানে বাল্মীকি শান্তাকে বলছেন অঙ্গরাজের মেয়ে, আর রোমপাদকে তাঁর ছেলে — অথচ আগের সর্গেই রোমপাদ নিজের মেয়ে শান্তাকে সম্প্রদান করলেন! এত বড় মহাকাব্যে এমন ছোটখাটো কন্টিনিউইটি-গলদ থেকেই যায় — পণ্ডিতরাও এ নিয়ে মাথা চুলকেছেন। আমরা যেমন আছে, তেমনই রাখলাম।)

"আর এর পরেই আসল লাইনটা, মহারাজ — 'যজ্ঞ করার জন্য মুখিয়ে থাকা ধর্মজ্ঞ রাজা দশরথ হাতজোড় করে ঋষ্যশৃঙ্গকে রিকোয়েস্ট করবে — যজ্ঞটা করে দিন, ছেলেও দিন, স্বর্গও দিন। আর সেই সেরা ব্রাহ্মণের হাত ধরেই তার মনের ইচ্ছে পূরণ হবে। চার-চারটে ছেলে হবে তার — একেকজন দুর্দান্ত পরাক্রমী, গোটা জগতে ছড়িয়ে পড়বে তাদের নাম। তারাই এই বংশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।'

"এই হল দেবপুত্র ভগবান সনৎকুমারের ভবিষ্যদ্বাণী — বহু বহু আগে, সেই দেবযুগে বলা।"

চারটে ছেলে! একটার জন্য যাঁর রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল, তাঁকে বলা হচ্ছে — একটা নয়, চার-চারটে! আশায় ভরে উঠল দশরথের বুক।

শেষে সুমন্ত্র বললেন — "তাই বলছি মহারাজ, দূত পাঠিয়ে এ কাজ হবে না। আপনাকে নিজেই যেতে হবে — সৈন্যসামন্ত, রথ-ঘোড়া নিয়ে, একেবারে ফুল স্টেট অনার দিয়ে ঋষ্যশৃঙ্গকে নিয়ে আসুন।" মানে, ভিআইপি গেস্ট — পিক-আপে রাজাকেই যেতে হবে।

আইডিয়াটা দশরথের মনে ধরল। গুরু বশিষ্ঠের পারমিশন নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন — সঙ্গে রানিরা আর মন্ত্রীরা। বন-জঙ্গল, নদী পেরিয়ে, ধীরেসুস্থে পৌঁছলেন সেই দেশে, যেখানে ঋষ্যশৃঙ্গ থাকেন।

গিয়েই দেখলেন — রোমপাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সেই ঋষি, তেজে একেবারে আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছেন। দুই রাজার মধ্যে দোস্তি তো আছেই, তাই রোমপাদ খুশি মনে, নিয়মকানুন মেনে, দশরথকে একেবারে স্পেশাল খাতির করলেন। ঋষ্যশৃঙ্গকে খুলে বললেন দুই রাজার বন্ধুত্ব আর আত্মীয়তার কথা। ঋষ্যশৃঙ্গও দশরথকে যথাযোগ্য সম্মান জানালেন।

সাত-আট দিন রোমপাদের বাড়িতে জমিয়ে আতিথ্য — আগে খাওয়াদাওয়া-আড্ডা, তারপর কাজের কথা। এবার দশরথ আসল কথাটা পাড়লেন — "মহারাজ, সামনে একটা বিরাট অনুষ্ঠান আছে। তোমার মেয়ে শান্তা আর জামাইকে কিছুদিনের জন্য আমার ওখানে পাঠাও।" রোমপাদ কথা দিলেন — "ডান! ও যাবে।" ঋষ্যশৃঙ্গকে বললেন — "যাও, বউকে নিয়ে একটু ঘুরে এসো।" ঋষিও বললেন — "ঠিক আছে।" রাজার কাছে বিদায় নিয়ে শান্তাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন।

বিদায়ের সময় দুই রাজা হাতজোড় করে প্রণাম জানালেন, তারপর ভীষণ আন্তরিকভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন — দুজনেই খুশিতে ডগমগ। বন্ধুর কাছে বিদায় নেওয়ার আগেই দশরথ ফাস্ট মেসেঞ্জার পাঠিয়ে দিলেন অযোধ্যায় — "এক্ষুনি গোটা শহর সাজিয়ে ফেলো!" রাজা ফিরছেন শুনে অযোধ্যার লোকজন আনন্দে মেতে উঠল — রাজার অর্ডার মতো চোখের পলকে সেজে উঠল গোটা শহর।

শাঁখ আর দুন্দুভির আওয়াজের মধ্যে, ঋষ্যশৃঙ্গকে সামনে রেখে দশরথ ঢুকলেন ঝলমলে অযোধ্যায়। ইন্দ্রের মতো দাপুটে রাজা নিজে যাঁকে এত খাতির করে নিয়ে আসছেন — সেই ব্রাহ্মণকে দেখে শহরের লোকজন একেবারে উচ্ছ্বসিত। শাস্ত্রের নিয়ম মেনে সম্মান জানিয়ে রাজা ঋষ্যশৃঙ্গকে নিয়ে গেলেন অন্দরমহলে। মনে মনে ভাবলেন — যাক বাবা, যাঁকে আনলে কাজ হবে, তিনি যখন এসে গেছেন, কাজ প্রায় হয়েই গেল।

আর শান্তা? বড় বড় টানা চোখের সেই রাজকন্যা স্বামীর সঙ্গে এসেছেন দেখে অন্দরমহলের মেয়েরা ভালোবাসায় একেবারে গদগদ। সবার — বিশেষ করে রাজার — আদরযত্নে শান্তা খুশি মনে স্বামীর সঙ্গে সেখানে কিছুদিন কাটাতে লাগলেন।

ব্যস, কাস্টিং কমপ্লিট। যজ্ঞের আসল কারিগর এখন অযোধ্যায়। এবার শুধু অপেক্ষা — ঠিকঠাক সময়টার।

পরের সর্গে বসন্ত আসবে, রাজা যজ্ঞের তোড়জোড় শুরু করবেন, আর ছাড়া হবে অশ্বমেধের ঘোড়া। পরের সর্গে আবার দেখা হচ্ছে — মিস করতে না চাইলে ফলো করে রাখুন Bong রামায়ণ।

উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.১০

সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)

#দশরথ#ঋষ্যশৃঙ্গ#শান্তা#রোমপাদ