বসন্ত এল, ঘোড়া ছাড়া হল — শুরু হয়ে গেল অশ্বমেধের তোড়জোড়

ততঃ কালে বহুতিথে কস্মিংশ্চিৎ সুমনোহরে।
বসন্তে সমনুপ্রাপ্তে রাজ্ঞো যষ্টুং মনোঽভবৎ॥
(তারপর বেশ কিছুকাল কেটে গেল। এল মনমাতানো বসন্ত — আর রাজার মন চাইল, এবার যজ্ঞটা হোক।)
ভাই, শান্তা-ঋষ্যশৃঙ্গ তো অযোধ্যায় দিব্যি জমিয়ে বসেছেন। দশরথও ঠিক তালে তালে ছিলেন — কখন ঠিক সময়টা আসে। তারপর একদিন এসে গেল বসন্ত। চারদিকে ফুল-টুল ফুটেছে, কোকিল ডাকছে, হাওয়ায় মিঠে গন্ধ — মন একেবারে ফুরফুরে। রাজা বুঝলেন, এই হল পারফেক্ট টাইমিং। এবার আর ল্যাদ খাওয়া নয় — এবার শুরু করতে হবে যজ্ঞের প্রস্তুতি।
মাথা নুইয়ে, পুরো ভক্তিভরে, দেবতার মতো ঝলমলে ঋষ্যশৃঙ্গকে অনেক খাতির-টাতির করে রাজা বললেন — "বংশটা টিকিয়ে রাখতে আমার যজ্ঞটা আপনিই করিয়ে দিন প্লিজ।" এত খাতির পেয়ে ঋষ্যশৃঙ্গও এক কথায় রাজি — "ঠিক আছে। আপনি সব মালপত্র জোগাড় করুন, আর যজ্ঞের ঘোড়াটা ছেড়ে দিন।"
ব্যস, গ্রিন সিগন্যাল! রাজা সঙ্গে সঙ্গে ডাকলেন তাঁর ভরসার লোক সুমন্ত্রকে — "সুমন্ত্র, এক্ষুনি বেদজ্ঞ পুরোহিতদের ডেকে আনো।" আর আমাদের আট নম্বর ব্যাটসম্যান? হেব্বি স্পিডে দৌড়লেন। ডেকে আনলেন সুযজ্ঞ, বামদেব, জাবালি, কাশ্যপ, কুলপুরোহিত বশিষ্ঠ — আরও সব নামজাদা ব্রাহ্মণদের। মানে, যজ্ঞের অল-স্টার টিম রেডি।
ধর্মপ্রাণ রাজা দশরথ তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে, এবং ধর্ম আর রাজনীতি দুটোই মাথায় রেখে, নরম গলায় বললেন — "বুঝলেন, ছেলে নেই বলে বুকের ভেতরটা হু-হু করে, কোনো কিছুতেই আর আনন্দ পাই না। তাই ঠিক করেছি, অশ্বমেধ যজ্ঞ করব। শাস্ত্রে যেমন যেমন নিয়ম আছে, ঠিক সে ভাবেই করতে চাই — যাতে ঋষিপুত্রের তেজে আমার মনের ইচ্ছেটা পূরণ হয়।"
রাজার মুখে এই কথা শুনে বশিষ্ঠ-সহ সব ব্রাহ্মণ একসঙ্গে বলে উঠলেন — "সাধু! সাধু!" তারপর ঋষ্যশৃঙ্গকে নিজেদের মুখপাত্র করে রাজাকে বললেন — "সব জিনিসপত্র জোগাড় করুন, ঘোড়া ছাড়ুন। ছেলের জন্য আপনি যখন এমন ধর্মসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন আর চাপ নেই — আপনার নিশ্চয়ই চারটে ছেলে হবে, আর তারা হবে দারুণ পরাক্রমশালী।"
আবার সেই চার! সনৎকুমারের ভবিষ্যদ্বাণীর পর এবার খোদ পুরোহিত-বোর্ডের সিলমোহর। দশরথ তো খুশিতে ডগমগ।
আনন্দে আটখানা হয়ে রাজা মন্ত্রীদের অর্ডার দিলেন — "গুরুদের কথামতো এক্ষুনি সব মালপত্র জোগাড় করো। ঘোড়াটাও ছেড়ে দাও — সঙ্গে যেন ষণ্ডামার্কা সব পাহারাদার থাকে। আর, আমাদের আচার্য তো থাকবেনই। সরযূর উত্তর পাড়ে যজ্ঞভূমি তৈরি করো, আর নিয়ম মেনে, ধাপে ধাপে শান্তি-স্বস্ত্যয়ন সেরে ফেলো।"
তারপর রাজা দিলেন আসল ওয়ার্নিং। আর এখানেই, ভাই, ব্যাপারটা হেব্বি টাইট —
"এই যজ্ঞ যে-কোনো রাজাই করতে পারেন — শর্ত একটাই, এই সর্বশ্রেষ্ঠ যজ্ঞে কোনো বড় ভুল যেন না হয়। কারণ পণ্ডিত ব্রহ্মরাক্ষসেরা দিনরাত ওত পেতে থাকে, কোথায় একটা খুঁত পাওয়া যায়। আর যে সব নিয়ম না মেনে এই যজ্ঞ করে — সে তক্ষুনি শেষ!"
হ্যাঁ ভাই, ঠিক পড়েছেন। ব্রহ্মরাক্ষস — মানে বিদ্বান ভূত! এমন ভূত, যে শাস্ত্র পড়ে বসে আছে, আর খাতা খুলে মিলিয়ে দেখছে কোথায় একটা মন্ত্র ভুল হল, কোথায় একটা আচার বাদ গেল। একটা গলদ পেলেই — ব্যস, কেলো! মানে যজ্ঞ তো নয়, ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম — আর এক্সামিনার একদল ভূত। এক নম্বর কাটা গেলেই খেল খতম।
তাই রাজা মন্ত্রীদের বললেন — "তোমরা তো এসব কাজে পাকা খেলোয়াড়। তাই প্রস্তুতিটা এমনভাবে সারো, যাতে আমার এই যজ্ঞ একদম নিয়ম মেনে, নিখুঁতভাবে শেষ হয়।"
মন্ত্রীরা সবাই বললেন — "তাই হবে।" রাজার কথা মেনে নিয়ে, ঠিক যেমন অর্ডার, তেমনভাবেই কাজে নেমে পড়লেন। ব্রাহ্মণরাও ধর্মজ্ঞ রাজার জয়জয়কার করে, বিদায় নিয়ে, যে যার জায়গায় ফিরে গেলেন। আর সবাই চলে যাওয়ার পর রাজা মন্ত্রীদের ছুটি দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন।
ব্যস, ঘোড়া ছুটেছে, যজ্ঞভূমি তৈরি হচ্ছে, ভূত-এক্সামিনাররাও রেডি। এবার শুধু অপেক্ষা।
কিন্তু কদ্দিনের অপেক্ষা? পাক্কা এক বছর! পরের সর্গে আবার বসন্ত আসবে, আর শুরু হবে যজ্ঞের আসল তোড়জোড়। পরের সর্গে দেখা হচ্ছে — মিস করতে না চাইলে ফলো করে রাখুন Bong রামায়ণ।
উৎস: বাল্মীকি রামায়ণ, বরোদা ক্রিটিক্যাল এডিশন, বালকাণ্ড ১.১১
সহায়ক পাঠ: Goldman et al., The Rāmāyaṇa of Vālmīki (Princeton UP, 2021)